নভেম্বর ১৮, ২০১৭

আবারো একটি ব্যাংক নোট সাবস্ট্রের জন্মোপাখ্যানঃ তাইভ্যেক

 আবারো একটি ব্যাংক নোট সাবস্ট্রের জন্মোপাখ্যানঃ

যদিও কাগজের মতো দেখতে, থাইভ্যাক [Tyvek] আসলে একটি সম্পূর্ণ সিন্থেটিক (মানব নির্মিত) উপাদান। ১৯৫৫ সালের দিকে, ডিউপন্টে নামের একটি ক্যেমিকেল প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক জনাব জিম হোয়াইট একদিন তাঁর একটি ল্যাবের পরীক্ষা চলাকালে পাইপ থেকে পলিথিনের তুলতুলে গুটি গুটি (ফ্লাফ) বের হতে দেখেলেন, তিনি এর আগে এরকম আর কখনো দেখেননি। তো একজন করিতকর্মা গবেষক হিসাবে তিনি তাৎক্ষনিকভাবে বিষয়টির ব্যাপারে এবং এর ব্যাবহারিক প্রয়োগের ব্যাপারে উপরমহলে জানালেন, এই ভাবে থাইভ্যাক ষাঠের দশকের শেষ দিকে বাজারে আসে

কাপড়ের মতো; থাইভ্যাক বুননের মাধ্যমের বানানো হয় না বরং প্রথমে প্লাস্টিক গলিয়ে একে অনেক জোরে ঘুরিয়ে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো তন্তুতে পরিবর্তন করা হয়,তারপরে  অনেক তাপ এবং চাপের দ্বারা অনেকটা পারটিক্যাল বোর্ডের মতো ব্যাবহারিক রূপ দেয়া হয়মূলত এটি ওলেফিন পরিবারের একধরনের তন্তু দিয়ে গঠিত যার ইতিহাস নিয়ে আলাদা গল্প লেখা যাবেএখানে না হয় থাইভ্যাকের কথাই বলি।

একটি প্রোডাক্ট ডেভলাপ করার সময় আমদের অনেক বিষয়ের খেয়াল রাখতে হয়,আর তা যদি জাতীয় সম্পদ (মুদ্রা) হয়,তাহলে তো কথাই নেই। কতো যে ধাপ পেরোতে হয় কেবল একটি সামান্য পরিবর্তনের জন্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আলোচনাকে সহজতর করতে আমি সামান্য কয়েকটি বিষয়য়ের ব্যাপারে ধারনা দিচ্ছি।

হালকা ওজন ও নমনীয়তা, অভঙ্গুরতা,জল প্রতিরোধ্ ক্ষমতা, মুদ্রণ এবং রূপান্তরযোগ্যতা, পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা ইত্যাদি আরও অনেক শর্ত থাকে যা দেশ ভেদে আলাদা হয়।

সেদিক থেকে দেখতে গেলে থাইভ্যাক অনেকাংশেই এসকল দাবি সমূহকে পূরণ করে। এটি রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় (কারন কোন আঠা ব্যাবহার হয় না)। যখন এটিতে পর্যাপ্ত তাপ ও চাপ প্রয়োগ করা হলে এটি আধা-শক্ত অবস্থায় ফিরে আসে (থার্মোপ্লাস্টিক ধর্মের কারনে) তাছাড়া, থাইভ্যাকের সাথে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরণের ক্যেমিক্যালি নিষ্ক্রিয় উপাদান বাজারে আছে যা এর ব্যাবহার এবং রূপায়নযোগ্যতা কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়।

থাইভ্যাকে কেন জনপ্রিয় হয়েছে?

ব্যাঙ্ক নোটের শর্ত পূরণ ছাড়াও থাইভ্যাকের জনপ্রিয়তার অন্যান্য কারন সমূহ হচ্ছে-এটি দেখতে কাগজের মত মনে হলেও, আদতে এটি কাগজ নয় তাই অনুভূতিতে আলাদা মনে হয়। থাইভ্যাক -৭০ ° C থেকে +১১৮ ° C পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। জল-প্রতিরোধী, কিন্তু বাষ্প বের হতে দেয়, , যার অর্থ হল জলীয় বাষ্প উপাদানটির পাতলা চাদরে প্রবেশ করতে সক্ষম, কিন্তু তরল জল নয়। ছেঁড়া বেশ কস্টসাধ্য কিন্ত কাটা সহজ। পরিস্কার করা সহজ তাই জীবানুমুক্ত রাখা সহজঅধিকাংশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে মুদ্রণযোগ্য এবং ল্যামিনেটিং,ওয়েল্ডিং,আঠা লাগানো ইত্যাদি অনেক ভাবে ব্যাবহারযোগ্যতা আছে। থাইভ্যাক ছেঁড়া ছাড়া বারবার ভাঁজ করলেও অনেকবার পর্যন্ত টিকে থাকে। ১০০% পুনর্ব্যবহারযোগ্যএমনকি এফ ডি এ পর্যন্ত একে খাদ্য সামগ্রীর কন্টেইনার হিসাবে ব্যাবহারের অনুমতি দিয়েছে।

থাইভ্যাক বর্তমানে সুরক্ষা কাপড়,বইয়ের পাতা এবং মলাট, ইন্সুলেশন উপকরন,ভবনকে জলীয় বাষ্প প্রতিরোধী করতে, মেডিক্যেল প্যাকেজিং,ডায়পার, গাড়ির সিট কভার,ড্রাইভিং লাইসেন্স, পরিধেয় কাপড়, ব্যেগ, ওয়ালপেপার, এমন আরও নানা অভাবনীয় ক্ষেত্রে ব্যাবহার হচ্ছে। এর মধ্যে আইলস অফ ম্যন, কোস্টারিকা এবং হেইতি এই তিনটি রাষ্ট্র আশির দশকের শুরুতে; ব্যাংক নোটে আলাদা উপকরন ব্যাবহারের জন্য চিন্তা শুরু করে। (*কেন শুরু করে এবং কেন বন্ধ হলো এবং তারপর কি হলো তা অন্য দিনের গল্প,জানতে চাইলে প্রশ্ন করুন)। 

 

 

সমস্যাঃ তাহলে বলবেন এটা চলছে না কেন ব্যেঙ্ক নোটে?

যদিও যেহেতু জল প্রতিরোধী তাই সাধারন পানি বাহিত রঙের কালি শুকাতে অনেক সময় লাগে,
আর লেজার প্রিন্টিং এর তাপে কখনো কখনো ম্যেটেরিয়ালটি বিকৃত হয়ে যার। 
যদিও এটি অগ্নি প্রতিরোধি না কেননা প্রায় ৮০ ° তাপমাত্রা কাছকাছি এতে গঠনগত বিকৃতি
 আস্তে শুরু করে। জল-প্রতিরোধী, কিন্তু বায়ু প্রতিরোধী না. UV ইনহিবিটর ব্যবহার 
না করলে খুব বেশি সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলে ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে. 
তেল-ভিত্তিক দাগগুলির জন্য একটি অনুরাগ আছে, যা পরিষ্কার করা খুব কঠিন হতে পারে,
 ভাঁজ করলে ক্রিয়েজ হয়

মার্চ ২১, ২০১৭

Repair and preservation

 কোন কিছু রিপেয়ার (সংরক্ষণ ও তত্বাবধায়ন) করার জন্য সেই বস্তুর গাঠনিক উপাদান জানা জরুরী। যেমনঃ অনেক পুরনো ভঙ্গুর কাগজ বাঁ খবরেরকাগজ জাতীয় দস্তাবেজ রিপেয়ার করার জন্য গমের মাড়, ভাতের মাড় বাঁ মিথাইল সেলুলোজ ব্যাবহার হতে দেখেছি। অনেক দেশের জাদুঘরে, পাঠাগারে এবং সংগ্রহালয়ে কিউরেশন/রক্ষনাবেক্ষনের কাজের জন্য জাপানিজ “KOZO”(কজো) বাঁ তুঁত (Mulberry)গাছের তন্তু থেকে তৈরি কাগজের অনেক সুনাম আছে কারন সেই সকল কাগজের ফাইবার গুলু বেশ আঁটসাঁট ভাবে থাকে, এতো পাতলা প্রোডাক্ট তৈরি করা যায় যা ব্যাবহারের পর প্রায় স্বচ্ছ মনে হয় । এছাড়াও অম্ল ক্ষারের নিরপেক্ষতা এবং ওজন কম (5-11 gsm) হওয়ার কারনে কন্সারভেশন টেপ, কন্সাভেশন টিস্যু, লেন্স টিস্যু ইত্যাদির মাধ্যমে অনেক ধরনের সংরক্ষণ এবং জরাজীর্ণ আইটেম সংস্কারে এর অবাধ ব্যাবহার দেখা যায় ।

সাধারন ব্যাবহারকারীদের সুবিধার্থে,এই ধরনের কাজকে সহজতর করার জন্য আর্কাইভাল টেপ, বিভিন্ন ধরনের রিভার্সিবল আঠা, হিট সেট টিস্যু, লেন্স টিস্যু, Abby Ph pen (কাগজ এসিডিক কি না সেটা যাচাই করার কলম), পলিএস্টার ফিল্ম, ব্লটিং পেপার,সল্ভেন্ট সেট টিস্যু ইত্যাদি অনেক প্রোডাক্ট বাজারে আছে। গুরুত্বপূর্ণ কাগজ সংস্কারে সাধারন টেপ ব্যাবহার করা উচিৎ না কারন সাধারন টেপ কিছু দিন পর ই বিবর্ণ হয়ে যায়, আদ্রতা এবং তাপমাত্রার পার্থক্যের কারনে কুঁচকে যায়, লাগানোর পর চারিদিকে দাগ হয়ে যায় আর তাছাড়া খোলার সময় তো কখনো কখনো কাগজের একটা পড়ত ই নিয়ে চলে আসে ফলে সার্বিক ভাবে আইটেমের কালেকশন ভ্যালু কমে যায়।

সংস্কার ও সংরক্ষণ যে কেবল ব্যাংক নোট বাঁ ডাক টিকেটের ই হতে এমন না। সেটা পুরোনো দলিল, বই, চিঠি, খাম,খবরের কাগজ,ম্যাচ বক্স বাঁ যে কোন কাগজী আইটেমের ক্ষেত্রেই বলছি। এমনকি যে এ্যালবাম বাঁ বাইন্ডারে রাখবেন সেটির বয়স এবং স্বাস্থের কোথাও বলছি। এ্যালবাম বাঁ বাইন্ডারের পেইজ পুরোনো হয়ে গেলে তাতে কি কি অসুবিধা হতে পারে তাঁর কথা বলছি।

উদাহরনঃ হিট সেট টিস্যুঃ কাগজ সংস্কারের সবচেয়ে সহজতর পদ্ধতি গুলুর মধ্যে আমার মনে এটির নাম প্রথমে আসে। এটি একটি খুব পাতলা টিস্যুর মতো যার এক দিকে রাসায়নিক ভাবে নিস্ক্রিয় আঠা থাকে এবং তাপ (১০০-১১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) দিলে এটি কাগজের গায়ে স্বচ্ছ হয়ে লেগে যায়।ফলে কোন কাগজের কোন অংশ মিসিং থাকলে সেখানে ফিলার হিসাবে ব্যাবহার তো করাই যায় বরং কোন ছেঁড়া থাকলে সেখানেও ব্যাবহার করা যায় কারন আবার চাইলেই (আইসপ্রোপাইল এলকোহলের সাহায্যে) একে কাগজের কোন ক্ষতি ছাড়াই খুলে ফেলা যায়।

তাছড়া রিপেয়ার করার গ্ল ু বাঁ আঠা ও একটি অন্যতম বিবেচনার বিষয় যে সেটা রাসায়নিক ভাবে নিস্ক্রিয় কি না, ঘনত্ব,ওজন, বর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা ইত্যাদি।

একসময় ঐতিহাসিক বই, পান্ডূলিপি ইত্যাদি সংস্কারের জন্য প্রানীজ আঠা বানিয়ে সেটা ব্যাবহার হতো কারন প্রানীজ চামড়া,তন্তু ,হাড় ইত্যাদি কানেক্টিভ টিস্যু থেকে Collagen (কলাজেন) নামে একটি আঠালো রাসায়নিক পাওয়া যায় যা আমাদের শরীরেরও গাঠনিক উপাদন গুলুর মধ্যে একটি। আজকাল আধুনিক বাঁধাই এবং সংস্করনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে আসিড ফ্রি PVA (পিভিএ),এক্রেলিক রেজিন, Aquazol (একুয়াজল) ব্যাবহার করলেও প্রাচীন পুঁথি এবং দস্তাবেজ সংস্কারের কাজে এখনো প্রানীজ আঠার চলন আছে।

এতশত কারনে যেকোন জায়গায় আপনার মূল্যবান সংগ্রহের আইটেমকে রাখা উচিৎ না বাঁ যেনতেনো ভাবে স্পর্শ করানো উচিৎ না। হিঞ্জিং টেপ, সেভিং পাউচ, এ্যালবাম পেইজ ইত্যাদি কেনার আগে নিশ্চিত হোন যে সেগুলু রাসায়নিক ভাবে নিস্ক্রিয় কি না, বিশেষ করে এসিড এবং লিগ্নিন মুক্ত কি না, বাফড না আনবাফড (কোনটি কোথায় ব্যাবহার করবেন)।

তারপর ভাবার বিষয় হচ্ছে- কাজটি কিভাবে করা হচ্ছে। আপনি হয়তো হিট সেট টিস্যু ব্যাবহার করছেন আপনার একটি পুরনো খবরের কাগজ/নোট/ টিকিট কে সারিয়ে তুলার জন্য, কিন্তু কাজটি করতে গিয়ে তাপ বেশী হয়ে গেলে কাগজের ছাপার কালি ব্লিড হতে পারে, আর তাপ কম দিলে আঠা কাজ করবে না বাঁ শেষ পর্যন্ত কাজে স্বসচ্ছতা আসবে না। তখন আপনার আইটেমটির মূল্য আবারো কমে যাবে। অন্যদিকে আপনি হয়তো সল্ভেন্ট সেট (পানি দিয়ে এক্টিভেট হয়) টিস্যু ব্যাবহার করছেন কোন ব্লোটিং পেপার ছাড়াই তখন অতিরিক্ত পানি যেখানে সেখানে পড়ে আপনার ডকুমেন্টের কালি ব্লিড করা শুরু করলো,তখন আপনি কি করবেন?কম আঠা দিলে হয়তো আপনার টিকিট/আইটেম জোরা লাগবে না, বেশী দিয়ে দিলে আইটেম কুঁচকে (Coccle)যযেতে পারে. আবার আঠার ধরন (আঠা শুকিয়ে গেলে যদি আপনার আইটেম খসে পড়ে?)। আইটেম এসিডিক হয়ে গেলে সাধারণত হলদে ভাব ধারন করে।

এত কিছু ভাবা লাগে বলেই রিপেয়ার করাটা আমার পেশা নয়। তবে যারা এগুলু নিয়ে আগ্রহী এটা তাঁদের কর্ম । এখানে অনেক অনেক অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞ্যান এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ধৈর্য থাকা টা জরুরী। তাই পেশাদারী ভাবে এগুলু করার আগে দীর্ঘ সময় অভিজ্ঞ কারোর অধীনে শিক্ষানবিশ থাকতে হয়। এবং সবার দ্বারা এগুলু হয়ে উঠে না।

যদিও ঐতিহাসিক দস্তাবেজের জন্য উপকরন এবং প্রক্রিয়া আলাদা।স নিয়ে অন্য কোথাও আলোচনা করা যাবে।